সারস্বত বুদ্ধদেব – একটি তথ্যচিত্র

 সারস্বত বুদ্ধদেব – একটি তথ্যচিত্র 

অর্ণব মিত্র 

বাংলা সাহিত্যের অভিভাবক যারা তারা একে একে অস্তমিত হচ্ছেন। করোনা মহামারি এই দেড়-বছরে কেড়ে নিয়েছে অনেক সাহিত্যিক ও সারস্বত মানুষের প্রাণ ।এদের মধ্যে যারা একটি নয়, শিল্পের অনেক প্রতিভায় প্রতিভাবান তাদের মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব গুহ।তিনি সাহিত্যে আজীবন বিচরণ করেছেন,পরে আঁকা ও গান দিয়েও সমৃদ্ধ করেছেন নিজের সৃষ্টির বৈচিত্রকে ও বাংলার প্রবাহিত সংস্কৃতিকে।তবে সবথেকে বেশি সফলতা এসেছে সাহিত্যে।কয়েকবছর লেখালেখি করেই হয়ে উঠেছিলেন ‘সুনিল-সমরেশ-সঞ্জীব’-দের সাথে প্রথম সারির।১৯৭৭ সালে পেয়েছেন ‘আনন্দ পুরস্কার’ও।

তার জীবন,সময় ও বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ধরে রাখা হয়েছে একটি তথ্যচিত্রে। তথ্যচিত্রটির নাম ‘সারস্বত বুদ্ধদেব’।পরিচালক বিক্রমজিৎ গুপ্ত।সম্পাদক প্রবীর গিরি।প্রযোজনা করেছেন রাহুল পুরকায়স্থ। 

তথ্যচিত্রটির শুরুতে শোনা যায় বুদ্ধদেব গুহর কণ্ঠে একটি পুরাতনী গান । গানটির কথা ছিল ‘ভালবাসবে বলে ভালবাসিনি’। সেই সময় ঘরের ভিতর দেখান হয় তার প্রয়াত স্ত্রী বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ঋতু গুহ-র একটি ছবি।গানের সাথে সাথে শোনা যায় ও শুরু হয় বুদ্ধদেব গুহ-র কথা।তিনি বলেন ‘লেখা যদি চিরস্থায়ী না হয়, অনেক দিনের চিন্তাভাবনা যদি তার মধ্যে না-থাকে তাহলে সেই লেখার গুরুত্ব থাকেনা’। তথ্যচিত্রটিতে তার সাক্ষ্যাৎকার নিতে দেখা যায় বিখ্যাত গদ্যকার শঙ্করলাল ভট্যাচার্জ-কে। এরপর তার জনপ্রিয় বইগুলিকে একে একে দেখান হয় ও তিনি তার ছেলেবেলার কথা বলতে শুরু করেন। স্বাধীনতার সময় ছোটবেলা কলকাতায় কিভাবে কেটেছে ভাড়াবাড়িতে ও  অসুবিধার মধ্যে তা তিনি বলেন।বলেন তার হেটে স্কুল যাওয়ার কথা ও স্কুল যাওয়ার সময় চলন্ত ট্রামে উঠেপড়া -ইত্যাদি। এরপর তিনি তার সাহিত্যিক জীবনের শুরুর কথা বলেন। শুরুতে তিনি কিভাবে আনন্দবাজারের সম্পাদক রমাপদ চৌধুরী ও সন্তোষকুমার ঘোষ-এর চোখে পড়েন ও তার শিকারমূলক উপন্যাসগুলি (হলুদ বসন্ত, কোয়েলের কাছে, মাধুকরী) প্রকাশের সাথে সাথে ধীরে ধীরে তার জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। এরপর শঙ্করলাল ভট্যাচার্জ প্রশ্নের সুরে বলেন যে তার সমস্ত লেখা কি পঁচাত্তর ভাগই তার নিজের জীবন থেকে নেওয়া। তার উত্তরে বুদ্ধদেব গুহ লেখেন যে আসলে পঁচাত্তর নয়, তার সমস্ত লেখার নব্বই ভাগই তার জীবনের ঘটনা থেকে নেওয়া। এরপর তিনি তার উত্তরবঙ্গের রংপুরের জঙ্গলে যাওয়ার কথা বলেন যেখান থেকে তার শিকারের কাহিনী লেখার শুরু।তিনি বলেন হেটে হেটে জঙ্গলে ঘুরে তার প্রকিতি সমন্ধে গভীর আকর্ষণের সুত্রপাত কিভাবে হয়েছিল। এছাড়া তার ঋজু-দা চরিত্র সৃষ্টির সময় কিভাবে সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট ফেলুদার প্রভাব পড়েছিল ও ঋজু-দার চরিত্রটি কিভাবে সয়ং ব্যক্তি সত্যজিৎ রায়-এর প্রভা্বে গড়ে উঠেছিল তাও তিনি বলেন।

এরপর তথ্যচিত্রে তার ও তার পরিবারের কিছু পুরনো ছবি দেখান হয়। তিনি তার গান গাওয়ার কথা ও ছবি আঁকার প্রতি ভালোলাগার কথা বলেন ও তথ্যচিত্রের মাঝে মাঝে কথাবার্তার মধ্যে তার কণ্ঠে গাওয়া কিছু গান শোনাযায় ও তার আঁকা কিছু ছবিও দেখানো হয়।তথ্যচিত্র শেষহয় তার কিছু কথাবার্তার ও তার গাওয়া গানের মধ্যে দিয়ে।

তবে তথ্যচিত্রে তার সময়ের বা এই প্রজন্মের কোন নামকরা সাহিত্যিককে দেখানো হয়নি যারা তার সমন্ধে দর্শককে নিজের মতামত বা ধারণা দিতে পারতেন ও তাতে তথ্যচিত্র ও ব্যক্তি বুদ্ধদেব গুহ-আরও সমৃদ্ধ হতেন। 

যেমন তরুণ গদ্য সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষাল বলেন আসলে তিনি ছিলেন জীবন রসিক।অরণ্যে অরণ্যে ঘুরে তিনি জীবনের সবুজতা,গভীরতা, মাদকতা খুজতে চেয়েছেন।বাঘ শিকারি বুদ্ধদেব ছিলেন বাঘের মতই সাহসী।এ বছর তার চলে যাওয়ার পরও পুজোসংখ্যায় উপন্যাস প্রকাশিত হবে। ডিক্টেসন দিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তার দৃষ্টি চলে যাওয়ার পরেও। বাঘের মত সাহসী ছিলেন বলেই পেরেছেন। 

একটি নামকরা পত্রিকার সম্পাদক,সিনেমা পরিচালক ও লেখক অনিন্দ্য  চট্যপাধ্যা্য় লিখছেন বুদ্ধদেব গুহ বড়দের বই লিখতেন ছোটদের পড়ার জন্য।

তার সম্মন্ধে তার বন্ধু ও প্রবীণ সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্যোপাধ্যায় লিখছেন শিল্পের বিভিন্ন বিভাগে তিনি বিচরণ করেছিলেন, সাফল্য কুড়িয়েছিলেন সাহিত্যে।কে কোন বিষয়ে লিখবেন তা অন্য কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারবেন না।এটি প্র্যতেকের নিজস্ব ব্যপার।বুদ্ধদেবকে আকর্ষণ করেছিল প্রকিতি,অরণ্য,পাহাড়,নদী আর প্রকিতির কোলে বসবাসকারী মানব পরিবার। অরণ্য গভীর, উত্তাল পাহাড়ি নদী,গভীর রাতে বাঘের গর্জন,সুন্দরী হরিণের লাফিয়ে জঙ্গল পেরনো,বনবালিকার শুকনো গাছের ডাল সংগ্রহ,-তাকে শহর ছাড়া করেছে। 

কবি জয় গোস্বামী তার সমন্ধে একটি পত্রিকায় লিখেছেন উনি কোনও দল তৈরি করে যাননি।তিনি ছিলেন একাকী।তার সঙ্গী ছিল তার লেখার চরিত্ররা,তার অরণ্য, তার জঙ্গল, তার নদী,তার সঙ্গীত,তার চিত্রকলা।তিনি একাকী এবং পূর্ণ। সঙ্গীতে পূর্ণ, সাহিত্যে পূর্ণ,প্রকিতি প্রেমে পূর্ণ,চিত্রকলায় পূর্ণ।


Comments

Popular posts from this blog

মহা ধুমধামে পালিত হলো "মাতৃভূমি আবাসনের খুঁটি পুজো"

বর্ণিকে বুদ্ধদেব স্মরণ : সুখেন দাস